‘এনআরসিতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই যা হবে সব মুসলিমদের’-
চোখে-মুখে ঘৃণার ক্রুর হাসি ঝুলিয়ে রেখে বলছিলেন কাকু সম্পর্কীয় এক ব্যক্তি চায়ের
আড্ডায়। ইনি সকাল হলে বাজারে সস্তায় কোথায় কুমড়ো পাওয়া যায় খোঁজ করেন, পেঁয়াজের
দাম বাড়লে বাড়িতে মাছের ঝোলে জিরের পরিমাণ বেড়ে যায়, মুরগি বওয়া গাড়িগুলোর মতো
লোকাল ট্রেনে পাঁচটাকায় যাতায়াত করেন। না ইনি দুঁদে নেতা, না ইনি কোনো উচ্চ পদাধিকারী। কিন্তু জীবনে
শঠতা, নীচতা ষোলোআনা। দেহের আকার বেড়েছে, বয়স বেড়েছে কিন্তু
মানসিক পরিধি থেমে গেছে বহুবছর।
আমাদের চারিদিকে এরকম ‘বায়োলজিক্যাল হ্যাজার্ড’দের মতো
ব্যক্তি দেখতে পাবেন গন্ডায় গন্ডায়। বলছি না বাজারে সস্তা জিনিসের খোঁজ করা অন্যায়,
অথবা ট্রেনে যেতে হয় বলে সভ্য মানুষ না। কিন্তু যে ব্যক্তিটির বেঁচে থাকার গন্ডি ওইটুকুতে
সীমাবদ্ধ, এর বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। কোটি কোটি মানুষের মতো এক ক্ষুদ্র প্রাণী।
যাকে প্রতি মূহুর্তে বেঁচে থাকার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যেতে হয় কিন্তু রাষ্ট্রের
যাঁতাকলে পিষে যেতে দেখেও টুঁ শব্দটি করেনা, বুঝতে চায়না অধিকার কিভাবে আদায় করে
নিতে হয়। আবার রাস্তায় সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে দেখলে গালি দেয়।
জেএনইউ, শান্তিনিকেতনে মুখ ঢেকে দেশপ্রেমের ঠিকাদাররা ছাত্র-শিক্ষকদের পিটিয়েছে
দেখলে খুশীতে ঢগমগ হয়ে ওঠে। ছাত্রের রক্তাক্ত পিঠ, ভাঙা হাত
দেখে তাদের বিবেক জাগেনা, মনে করে উচিত শিক্ষা হয়েছে, আরও এক’সরেস্ এগিয়ে বলে
ছাত্রের কাজ রাজনীতি করা নয়, ছাত্রের কাজ শুধু পড়াশোনা।
খবরের কাগজে খোঁজ করেন ধর্ষকের ধর্ম কি, অপরাধী কোন ধর্মের।
রাজনৈতিক জড়বুদ্ধি, অসামাজিক, অমানবিক ব্যক্তিত্বে সমাজ ভরে
যেতে দেখলে আশংকা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এনআরসি, এনপিআর কেন মানবহিতৈষী নয় নতুন করে বোঝানোর কি কিছু
আছে? ধর্মের চেয়ে মানুষ বড়, অনেকটা বড়, ধর্মের আগে মানবতা। জাতি-ধর্ম
দিয়ে বিভাজনের চেষ্টা কেন সমাজের জন্য ধ্বংসাত্বক এবং অনিষ্টকারী যদি এই সময়ে
দাঁড়িয়ে বোঝাতে হয় তবে বুঝে নিতে হবে সেই সভ্যতা-জাতি-রাষ্ট্রের মানুষ নিকষ
অন্ধকারে আটকা পড়ে আছে।
একসময় এমনই ঘৃণা ছড়িয়ে জার্মানির আকাশ লাশপোড়া কালো ধোঁয়ায়
বিষিয়ে উঠেছিল। সেদিনও এইধরনের
মানুষেরা ছিলেন যারা মনে করতো যা হবে সব ইহুদীদের ওপর, আমার তাতে কি!
সদ্য পাশ হওয়া এক্ট-এ সবচেয়ে বিপদে পড়বে গরীব, দিন আনি দিন
খাই মানুষেরা, ডিমানিটাইজেসনেও দেখার পরেও ঘুম ভাঙেনি, নাকি এখনও দুইহাজারের নোটে
চিপ খুঁজছেন?
একজন সাধারণ আর পাঁচটা মানুষের মতো রাষ্ট্রের নিপীড়িত
ব্যক্তি হয়েও রাষ্ট্রীয় পৈশাচিক নীতিকে সাপোর্ট করার মানেই হলো নিজেদের সাথে
বেইমানী করা।
পার্লামেন্টকে
ধর্ষক, অশিক্ষিত, খুনীদের ঢুকিয়ে গরুর খোঁয়াড় বানিয়েছি তার অন্যতম একটা কারণ
স্বপ্ন দেখেছি হিন্দুরাষ্ট্রের।
ধর্মীয় ঘৃণার সাথে হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা
নীচবু্দ্ধিদের কে বোঝাবে যে পাশাপাশি কয়েকটা ধর্মীয় রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে দেখো কি
হয়ে আছে ওই দেশ নামক নরকগুলি। বাংলাদেশের মৌলবাদীদের ঠেলায় মুক্তচিন্তকরা দেশছাড়া
হয়ে পড়েছে, পাকিস্তানে ব্ল্যাসফেমী আইনে কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে, মধ্য-প্রাচ্যের দেশে
জিন্স টিশার্ট পরে কোনো মহিলা বেরিয়ে পড়লে পরেরদিন তারা ফারেসদের মতো খুন হতে হয়। সংস্কৃতি,
বিজ্ঞান, সাহিত্য, প্রেম, সিনেমা, ছবি, গান থেমে গেছে।
ভাবি হিন্দুরাষ্ট্রে গেরুয়া ফেট্টি পরে মস্তান, অশিক্ষিত,
নোংরা চিন্তকরা পাড়ায় পাড়ায় মোরালিটি করে যাবে এটা কোরো না ওটা করোনা বলে? ধর্মের
ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রতিটা দেশেই অশিক্ষা, অনৈতিকতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পচা নর্দমা হয়ে
গেছে। সেখানে ভারত একটু একটু করে ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে সরে যাওয়াকে
যাদের অবক্ষয় মনে হয়না তাদের মানুষ হিসেবে যদি নিজেকে আজও বোধ হয় তবে লজ্জা পাওয়া
উচিত।
কাল দিল্লীতে জারি হচ্ছে জাতীয় নিরাপত্তার নামে চুড়ান্ত
বর্বর আইন এনএসএ, যা দিয়ে গনতন্ত্রের টুঁটি টিপে ধরা হবে, আপনি প্রতিবাদটুকুও করতে
পারবেন না। আপনার কি, সব তো ‘ওরা’ মরবে।

Comments
Post a Comment