প্রবীর ঘোষ ও বাঙালির গুরুবাদী আবেগ।


বাঙালির দোষ হলো তার সবসময়ই আইকন চাই নইলে সে যেনো চলতে পারেনা।কারোর পায়ে নিজের মগজটি গুঁজে রেখে দিতে পারলে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এই কারণেই নরেন্দ্রনাথ দত্ত বাঙালির আইকন আর রবি বাবুও তাই।
এর অর্থ এই নয় যে বাঙালি নরেন্দ্রনাথ বা রবি ঠাকুর খুব পড়ে।পড়েনা বরং গুছিয়ে সাজিয়ে বেশ আভিজাত্যের ভান করে এসেছে বহুকাল থেকে।রবি ঠাকুর তবুও সামান্য কিছু পড়লেও বিবেকানন্দ তো ছুঁয়েও দেখেনা,ওই দুটাকার বাণী বইগুলো ছাড়া।
এই আইকন আবার রক্ত মাংসের কোনো মানুষ নয়,আপনার পাশের পাড়ার কাকু কিংবা জেঠু নয়,তিনি সিদ্ধ পুরুষ,তিনি মানব সমাজের উর্ধ্বে থাকা দোষহীন জ্যোতির্ময় মানব।
এই নেতিয়ে পড়া জাতির নিকট অভাবনীয়ভাবে বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিরা সবসময়ই ব্রাত্য।
বিজ্ঞানের কথা যখন বললাম তখন বেশকিছুজন ভাবতে শুরু করেছেন কোন কোন বাঙালি বিজ্ঞানী ব্রাত্য হয়ে গেছে,কিন্তু বিজ্ঞানী আর বিজ্ঞানমনস্কতা দুটির ভেতরে পার্থক্য রয়েছে বিস্তর,সে পার্থক্য করতে শিখিনি বরং কিভাবে আদর্শের বারোটা বাজিয়ে ব্যক্তিপূজা করতে হয় শিখেছি,শিখেছি বিদ্যাসাগর বিবেকানন্দের ফটোতে ধুপ-ধুনো দিয়ে সাজিয়ে রাখতে।অবশ্য আদর্শ বলে কিছু ছিলোনা;আদর্শ মোর তাই,সেদিকে স্রোত যায় সেদিকেই ধাই।
যাইহোক সাধারণ মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করার দায় নিয়ে যে ক'জন বাঙালি কলম চালিয়েছেন তাদের নাম হাতেগুনে বলে দেওয়া যায়।বিদ্যাসাগর মশাই তাদের একজন।আচ্ছা এখানে একটু বলে নিই বিজ্ঞানমনস্কতা বলতে জটিল ফিজিক্সের সুত্র কিংবা বানরের ডি.এন.এ কোন প্যাঁচে প্যাঁচিয়ে আছে বুঝতে বলছিনা,বিজ্ঞানমনস্কতা বলতে সবকিছুকে যুক্তি দিয়ে বাজিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া,আবেগে চালিত হওয়া নয়।
বিবেকানন্দ বাবুর সবাই গুণগান করে,শুনেছে আমেরিকায় লোকেদের তাক লাগিয়ে এসেছে!মুচি মেথর ভাই বলেছেন তাই আমিও গুণগান করি কিন্তু যখন বলবেন উনিই যে বলেছেন -ভাই তুই বামুন,মুচির বাড়িতে খাসনে তখন এই আপামর বাঙালিই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবে,এতোদিন যা শুনে এসেছে তার বাইরে কোনোভাবেই শুনতে রাজি নয়। না,বই পড়ে সত্য জানার পর যে তেলেবেগুনে হয়েছে তা কিন্তু নয়, বই সেই বইয়ের জায়গাতেই আছে ল্যাপথালিন দিয়ে সুন্দর করে সাজানো।
আবার বিদ্যাসাগরে ফিরে আসি। বিদ্যাসাগর মশাই বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন আগেই বলেছি কিন্তু এই যে বললেন বিজ্ঞানমনস্কদের বাঙালি সম্মান দেয়নি, বিদ্যাসাগর মশাই তো খুব পপুলার লোক,তবে?
না,বিদ্যাসাগরের প্রতি যা সম্মান তা তাঁর জেদি একগুঁয়েমি অধার্মিক আদর্শের প্রতি নয়,তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতার প্রতি নয়। বিদ্যাসাগর যখন বেঁচে ছিলেন বিজ্ঞানমনস্কতা ছড়ানোর জন্য রাস্তাঘাটে হেব্বী খিস্তি খেয়েছে,পিটিয়ে মারতে চেয়েছে এই বাঙালিই,তখন ফেসবুক থাকলে তো পোষ্টগুলো এরকম হতো 'দেখুন যশুরে কৈ এর ভন্ডামো ফাঁস!'। গসিপ,কুৎসা,পরচর্চার জন্য এই জাতি কেন এখনও গিনিজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করেনি সেটাই আশ্চর্য হই।
আস্তে আস্তে আপামর বাঙালি কিছুটা বিদ্যাসাগরকে বুঝেছে কিন্তু তা তার অধার্মিকতাকে পোটলা বন্দি করে জলে ফেলে দিয়ে নিজের ভাবনার ধাঁচে এক বিদ্যাসাগর গড়েছে তাই 'বিজ্ঞানমনস্ক বিদ্যাসাগর' বাঙালির পরিচিত হয়নি কোনোকালেই বরং দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর বাঙালির বেশি বেশি পরিচিত।
আবার এদিকে 'যুক্তিবাদী' নামী কিছু ব্যক্তি ইনার অধার্মিক আদর্শে এতোটাই মজেছেন যে বিদ্যাসাগর মশাইয়ের মাথার পেছনে একটি দিব্যজ্যোতি দেখতে শুরু করেছেন ‌যেমনটা বিবেকভক্তরা দেখেন মানে ব্যক্তিপূজার মোহ যুক্তিবাদীরা(?)ও কাটিয়ে ওঠেনি।আইকন বানিয়ে মগজ দিলাম তোমার চরণতলে ভাবনা আপামর বাঙালির রয়েছে,কে কোনটাতে দেবে সেটাই হলো কথা।
বাঙালি এমনিতেই বই তেমন পড়েনা সিরিয়াল দেখে বেশি, তার ওপর বিজ্ঞানমনস্কতার বই হলে তো গুটিকয়েক হাতেগোনা জন পড়ে নইলে সব পাশ কাটিয়ে চলে যায়।অবশ্য না পড়ার একটা সামান্য একটা কারণ আছে, বাংলায় বিজ্ঞানমনস্কতা বাড়ানোর বেশিরভাগ বইগুলো কেমন যেনো মেদোমারা,গুরুগম্ভীর,বইগুলো থেকে কথা জোর করে করে বের করতে হয়,ধরি মাছ না ছুঁই পানি করে বলা।
প্রবীর ঘোষ মশাই এই ছক ভেঙে সোজা রাস্তা নিলেন একদম রাখঢাক না করে। 'অলৌকিক নয় লৌকিক' সিরিজ যেনো 'আ স্টাডি ইন স্কারলেট' শুরু হলে শেষ না হওয়া অবধি নাওয়া খাওয়া ভুলে যাওয়া।
বাঙালি সমাজে যুক্তিবাদের ওপর এতোবড় ব্লাস্ট প্রথম।প্রচলিত তাত্ত্বিক বই লেখা ছেড়ে ইনি নামলেন বাস্তবের মাটিতে আর সেগুলোকে তুলে দিলেন বইতে।যুক্তিবাদের সীমানা কতোখানি বিস্তৃত হতে পারে তা দেখালেন সরাসরি।
দুর্দান্ত কোনো মুভি দেখার পর যেমন রেস থেকে যায়, ইনার বই পড়ার পরেও বহু বাঙালির মগজে একই হলো।
সুন্দরবনের নদীর চরে ঘুরে বেড়ানো মেঠো ছেলের থেকে শুরু করে পুরুলিয়ার আদিবাসী যুবকের মগজে কিলবিল করে উঠলো যুক্তির শনশন ঝাপটা।ধর্ম,সামাজিক সিস্টেমকে যেনো আজই এখুনি ভেঙে দিতে পারলে ভীষণ খুশী হয়।
কিন্তু এখানে আর একটা গল্প আছে,এই ছেলেদের আইকন এবার বিবেকানন্দদের ছেড়ে প্রবীর ঘোষে পরিবর্তিত হয়ে গেলো,সেই দিব্যজ্যোতি বজায় রইলো শুধু ব্যক্তির স্হান পরিবর্তন হলো।এই বইগুলো আর বই রইলো না,হলো 'ধর্মগ্রন্থ'।
দিব্যজ্যোতি যুক্ত যে কল্পিত ব্যক্তির কল্পনা ভক্তরা করেছিলেন তা বাস্তবের প্রবীর ঘোষ ওইরূপ হতে ব্যর্থ হলো।ইনি রগচটা,একগুঁয়ে,জেদী,ভীষণ ঠোঁটকাটা যা মনে হয় বলে দেয় কে কি ভাববে সেদিকে তোয়াক্কা না করেই,খিস্তি মারে,আবার উল্টোদিকে ভীষণ খোশমেজাজী।এতোদিন ভক্তরা দেখে এসেছে আইকন মানে হলো নম্র-ভদ্র-শান্তশিষ্ট,সুখে-দুঃখে নিশ্চল,একটা গুরুগম্ভীর ভাব থাকবে কিন্তু সেসব ছক এখানে রইলো না।
আর এদিকে যতই ফলোয়ার বাড়ছে প্রবীর মশাইয়ের আত্মবিশ্বাসের পারদ চরচরিয়ে সীমানা পেরোচ্ছে সে দিকে ভ্রক্ষেপ দিতে নিজেই গেলেন ভুলে।
নিজের নেতৃত্বে সংগঠিত করে বাংলার বুকে যুক্তিবাদের যে ধাক্কা দিলেন তা বাংলা ছেড়ে গোটা বিশ্বের যুক্তিবাদীদের নজর কাড়লো,ভারতের বাইরে যদি সবচেয়ে কোথাও যদি বেশি প্রভাব পড়ে থাকে তা হলো বাংলাদেশে।গড়ে উঠলো বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি।এর একটা কারণ অবশ্য হলো দুই বাংলার রয়েছে ভাষা ও সুসম্পর্ক।
সরোজ বাবু একটা কথা বলেছিলেন -যে কলমের দিকে রাষ্ট্রের বুলেট ধেয়ে আসে না সে কলমটি রাষ্ট্রের কাছে নিশ্চিত বিক্রি হয়েছে ,এইরুপ রাষ্ট্রের থেকে প্রবীর বাবু কলম বিক্রি হওয়া থেকে বাঁচতে সমস্ত চেষ্টা করলেন কিন্তু উল্টে ভক্তরা কিছু বিক্রি হয়ে গেলো,যাদের কাজে লাগানো হলো প্রবীর ঘোষকে ডিফেম করতে।
ডিফেম করার চেষ্টা হয়নি স্রোত পাল্টাতে চাওয়া এমন বিখ্যাত ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া মুশকিল,সেদিন একটি ভিডিওতে দেখছিলাম ‘দ্যা গড ডিলিউশন’ এর লেখক রিচার্ড ডকিন্সের প্রতি কেমন হেট স্পিচ আসে জানাচ্ছিলেন ওনার ইমেইল খুলে।শ্রেণী চেতনা নিয়ে তেমন কিছু বলেননি নইলে ডকিন্স বাবুর অবস্থা আরও কি হতো কে জানে!
প্রবীর মশাই যদি কোনো রাজনৈতিক দলের টিকিট নিয়ে ভোটে বসে যেতেন তাতে ব্যাংকের কেরাণীর চাকরি না করে ক্ষমতা,দূর্নীতির কোটি কোটি টাকা,ছেলেপুলের ভালো চাকরি সবই পেতে পারতেন। তা না করেও অন্তত মগজবেচা বুদ্ধিজীবী তো সহজেই হতে পারতেন তাতেও টাকা,লাইমলাইটের ঝলকানি সবই দুর্দান্ত পেতেন।
যাইহোক যেখানে ছিলাম,ব্যক্তি জীবনে প্রবীরও ভুল করেছেন,তারমধ্যে সবচেয়ে বড় ভুল করেছেন নিজের হাতে গড়া সমিতির প্রতি অতিরিক্ত আবেগ ও ভালোবাসার জন্য পজেসিভ হয়ে পড়া।এবং উৎপটাং এমন কিছু বলেছেন যেগুলো অনেকেরই পছন্দ হয়নি।
এতে হয়েছেটা কি অন্ধভক্তরাই অন্ধবিরোধী হয় এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
অন্ধবিরোধী বা অন্ধভক্ত হওয়ার একটা মজা হলো কিছু বেড়ালের সাথে বেশকিছু রুমালকেও বেড়াল বানিয়ে চালিয়ে দেয়,তাই এদের কথা সবসময়ই সন্দেহের চোখে দেখতে হয়।
'সংস্কৃতিঃসংঘর্ষ ও নির্মাণ' কেন,কি চাইলেন লেখক প্রবীর ঘোষ,যুক্তিবাদ কিভাবে সাংস্কৃতিক সমাজ কাঠামোতে আঘাত করে,কেনইবা কুসংস্কার দুর করতে চাওয়ার সাথে সাথে শ্রেণীচেতনা ঢোকাতে চাইলেন।এগুলোকে নির্বুদ্ধের মতো কপি-পেস্ট না করে নিজে নিজে রিয়েলাইজ করলে অন্ধভক্ত আর অন্ধবিরোধী হওয়া থেকে মুক্তি পেতে পারেন।
হ্যাঁ, এটি অন্ধভক্ত ও অন্ধ বিরোধীদের তমসার চাদরে একটু টান দেওয়ার চেষ্টা করা হলো।
 Image may contain: 1 person, smiling, glasses
প্রসেনজিৎ_কোনার
১৩.০৯.২০১৮

Comments