ঊপরের প্রশ্ন দুটি অনেকেই করায় তাঁদের ঊত্তরগুলো মানবিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টায় লেখায় হাত দিয়েছি।
সরস্বতী পুজোর পক্ষে বেশ ভালো মানবিক যুক্তি দিয়েছেন অনেকে তারমধ্যে একটা যুক্তি সমস্ত দৃষ্টি টেনে নিয়ে যেন মনের কথা গুলোই বলে দিলো,"স্কুলে সরস্বতী পুজোটা ঠিক ধর্ম পালনের জন্য করা হয়না। এটা একটা উৎসব যেখানে সকল ছাত্র ছাত্রী রাই সমান ভাবে অংশগ্রহণ করে। এটা তাদেরই উৎসব। পুজো ঘিরে একটা আনন্দ উদ্দীপনা থাকে সকল ছেলে মেয়ের মধ্যে। তারা নানান কাজে নিয়োজিত থাকে। কেও ফুল আনে কেও আলপনা দেয় কেও প্রসাদ বিতরণ করে একটু বড় ক্লাসের ছেলে মেয়েরা পাশের স্কুল গুলোতে আমন্ত্রণ পত্র পৌঁছে দেয়। তাছাড়া একসাথে বসে প্রসাদ খিচুড়ি পোলাও খাওয়া মাস্টার মশাই দিদিমণি দের সাথে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া সায়েন্স এক্সিভিশন অঙ্কন প্রদর্শনী দেওয়াল পত্রিকা প্রকাশন এইসব কিছুর মধ্যে ধর্ম পালন একটাই সেটা ছাত্র ধর্ম পালন। কারণ উপরোক্ত প্রতিটা কাজ একজন ছাত্র বা ছাত্রীর মধ্যে দায়িত্ব বোধ সৃজনশীলতা সহযোগিতা পরস্পর মিলে মিশে কাজ করার প্রবণতা এই গুন গুলোকেই বাড়িয়ে তোলে। সবাই তো একদিন ছোট ছিলাম নিজেদের ছোটবেলা গুলো ভাবুন সেই সাথে এখন যারা ছোট তাদের খুশি মুখ গুলোর কথাও ভাবুন। হিন্দু মুসলমান সেকুলার এই সব ছোটখাটো শব্দ গুলোর অনেক উর্ধে নিজেকে খুঁজে পাবেন। তখন সরস্বতী পুজোকে শুধুমাত্র হিন্দু ধর্ম পালন মনে হবে না আশাকরি।"
সত্যিই আমরাও যখন ছোটছিলাম সরস্বতী পুজোর দিনগুলো এমন করেই আনন্দ করেছি।তখন প্রাইমারীর গন্ডিটুকু পার হয়নি,নিজেরা পুজো করার জন্য প্রায় মাসখানেক আগে থেকে প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছি,সবাই মিলে অন্যের ধান জমিতে কাজ করে সাথে কাকুদের রাস্তায় ঘিরে ধরতাম ওনারাও আবদার রাখতে একটাকা দুটাকা দিতো সেই চাঁদা তুলে পুজো করার সে কি অপার আনন্দ!পুজোর আগের কটা দিন বাড়ি মুখো হয়নি,ফুলচুরি,সাজানো,সকাল সকাল স্নান করে ধুতি পরে খালি পেটে পুস্পাঞ্জলির দেওয়ার মাঝে সীমাহীন পবিত্রতা পেয়েছি কখনোই মনে হয়নি ধর্মে ডুবে গেছি ,মাস্টার মশাইরাও সে কটা দিন আরও বন্ধুর মতো হয়ে যেত! আজও সরস্বতী পুজোর দিনগুলোতে স্কুলে তাই হয়। মাদ্রাসাতেও শিশুগুলো নিশ্চয়ই এমন করেই আনন্দ করে তাদের দিনগুলোতে!
তবে বাধা কিসের?
একবার ভাবুনতো আমরা অলৌকিক শক্তির কাছে ছোট-ছোট শিশু গুলোকে মাথা নোয়াতে শেখাবো?
আনন্দ-পবিত্রতা-ঊদ্দীপনা ছোটবেলার সমস্ত অনুভূতিগুলোকে আরও সুস্থভাবে ওদের কাছে পৌঁছে দিতে পারিনা?একটা ঘটনা মনে পড়লো,সেবছরও পাড়ার দাদারা পুজো করছে কিন্তু এবছর একটা বিশেষ লক্ষ্যে,আর তা হলো মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করে যাওয়ার জন্য!আমি তখন প্রাইমারি স্কুলে,আগে একবার ফেল করে যাওয়ায় এবছর টার্গেট নিয়েছে পাশ করলে তারপরই সরস্বতীর ভাসান হবে নইলে নয়,বেচারা দাদাগুলোর একজন ছাড়া সেবছর আবার সবাই ফেল করেছিলো আর ভাসান তো হলোইনা ঊল্টে যাদের বাড়িতে প্রতিমা মূর্তি ছিলো সেবাড়ির এক পুচকি পুতুল সাজানোর জন্য আস্তে আস্তে সব খুলে নিয়েছিল!সরস্বতী তার ভক্তদের ইচ্ছে পুরন করতে না পারায় আমাদের পাড়ায় সরস্বতী পুজো সেবছর থেকে বন্ধ হয়ে গেল,আর এদিকে দাদাগুলো পড়া থেকে নির্বাসন নিয়ে লক্ষীদেবীর আরাধনায় মত্ত হয়ে পড়ে(লক্ষীদেবীও আজও মুখ গোমড়া করে রেখেছে )।
জগদীশ চন্দ্র বোসের জীবনী পড়লে বুকটা সীমাহীন গর্বে ভরে যায়,এমন মানুষেরাও আমাদের এই বাংলায় জন্মেছেন!প্রফুল্লচন্দ্র রায়,ইনাদের জন্মদিনটা যে কবে তাইই জানিনা!সরস্বতীর মতো কাল্পনিক দেবদেবী ছেড়ে আমরা সরস্বতী পুজোর মতো আনন্দ করেই জগদীশচন্দ্রের আদর্শে মেতে ঊঠলাম আনন্দ নাচ-গান-কবিতা-নাটক-সায়েন্স এক্সিবিশন-একসাথে খাওয়াদাওয়া কতোকি!! কি করা যায়না?
আমাদের ছোটবেলায় আমার সমাজ আমাকে অলৌকিক শক্তির কাছে পবিত্রতা নিতে শিখিয়েছে তাই জগদীশচন্দ্রের আদর্শের কাছ থেকে তাই পবিত্রতা পাইনি,অলৌকিক শক্তির কাছে নত হয়ে পরীক্ষায় পাশ করে যাওয়ার আকুতি কাজ করেছে,যে কারনে সরস্বতী পুজোর জন্য চাঁদা তুলেছি,আনন্দ করেছি অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিলোনা,আমরা চাইলেই এই পরিবর্তনগুলো করে বিজ্ঞান সাহিত্য ইত্যাদিতে ছোটদের মননের বিকাশ আরোও সুস্থ ও সুন্দর করে দিতে পারতাম।ছোটরা তখন জগদীশের আদর্শের আবেগে আত্মহারা হয়ে ওইসময়গুলোতে বাড়ি মুখো হলোনা আর! কাল্পনিক দেবীর জন্য অশ্লীল শব্দ ঊচ্চারন করে পুস্পাঞ্জলির জন্য নয়,প্রকৃত হৃদয়বান ব্যক্তিত্বের আদর্শের জন্য পুস্পাঞ্জলি দেওয়ার জন্য না হয় 'ফুলচুরি' করলো! আমরা ওদের সুযোগ দিলে ওরা আরও সুন্দর হয়ে গড়ে ঊঠতো।
নির্মাণ করতে না জানলে ভাঙায় হাত দিতাম না কোনোদিন,এটা অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া নয় বরং প্রকৃত আলোর জন্য রাস্তা তৈরি,সরস্বতী পুজো বন্ধ করা সেই আলোর রাস্তা তৈরি করার একটা ধাপ মাত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন,সমাজে কিছু মানুষ আছে যারা কোনো পরিবর্তন চাননা নতুনকরে ভাবতে চাননা,আমরা তেমন করে মননকে স্হির করে দিইনি তো?আমরা সরস্বতী পুজাতেই স্হিরতা পেয়েছি এই আবেগ থেকে বেরিয়ে নতুনকরে নতুন আনন্দে মননকে গড়ে নেওয়ার জন্য বোধহয় তৈরি করতে পারিনি!
আমাদের সমাজ আর 'ধার্মিক' চায়না সমাজ 'মানুষ' চায়,স্কুলে ধর্মের প্রাথমিক পরিচয় করিয়ে দেওয়া বন্ধ হওয়া প্রয়োজন এই সমাজের জন্যেই। সমস্ত প্রকার শিক্ষাঙ্গনে এই প্রকার পরিবর্তনের জরুরি প্রয়োজন।
এরপর পরবর্তী অংশে আসি,
সাংবিধানিক কারনেই সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সরস্বতী পুজো দুরে সরাতে চাই সেটা সমস্ত প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেই এক,সে হোক না মাদ্রাসা কিংবা মিশনারি।
ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞাটি বহুজন বিকৃত করেছেন বা ভুল ভেবেছেন যে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে হলো সকল ধর্মের পক্ষে,আসলে তা নয় ধর্মনিরপেক্ষতার মানে হলো কোনো ধর্মের পক্ষে নই,এই হিসেবেই সরকার সাংবিধানিকভাবে নিজেদের সকল ধর্ম থেকে দুরত্ব রাখে,যদিও ভোটসর্বস্ব রাজনীতিতে ওনারা তা এতোটাই অহরহ লঙ্ঘন করে চলেছে যে তাইই মান্যতা পেয়ে যাচ্ছে জনগণের কাছে!আপাতত প্রতিটা শিক্ষকের ঊচিত ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা ভালোভাবে জানা তবেই ওনারা সাংবিধানিক অবমাননা করতে তাদের ছাত্রছাত্রীদের ঊৎসাহ দেবেন না।
আজ সরকারি প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পুজা বন্ধ হলে জাতির মেরুদন্ড শক্ত হবে। আপনিই এরপর দাবি তুলবেন থানায় কালিপুজা বন্ধের, সরকারি ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে ধর্মাচরনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবেন,সরকার ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে চার্চ,মিশনারি,মাদ্রাসা ইত্যাদিকে ধর্মমুক্ত করতে।
আজ আপনি বলছেন মাদ্রাসা নিয়ে কি ভাবছেন,অথচ আমরা সচেতন হলে সরকার সমস্ত সরকারি সাহায্য পুষ্ট প্রতিষ্ঠানকেই ধর্মমুক্ত করতে বাধ্য করবে না মানলে সাহায্য বন্ধ করে দেবে অবশ্য আপনি সচেতন হলে।সাথে ওদেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন আর তা আসছেও অনেকে।
একটু আগুনের ফুলকি বহুদূর ছড়িয়ে সমাজ কে একটা আলোর দিশা দেখাবে,এবার শুধুমাত্র আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন।

Comments
Post a Comment