পকেট পুরো খালি, মেস খরচ চালাতে হিমসিম খাচ্ছি , গায়ে অতো জোরও নেই যে মোট বয়ে কিছু ইনকাম করবো, তাছাড়া কোথায় কিভাবে কাজ করবো তাও জানিনা, আমার কাছে একমাত্র সহজ পথ এই প্রাগৌতিহাসিক মগজটাকে ব্যবহার করা অর্থাৎ টিঊসান দু-একটা করলেই বাড়িতে না জানিয়ে মোটামুটিভাবে ওদের কষ্টের কিন্চিত রেহাই দেওয়া যায়।
ছাএের সন্ধান এলো, আমি ভেবেছিলাম কোনো এক ঊচ্চ নিবাসীর ড্রয়িংরুমে তাঁদের ল্যাডলি রাজপুত্রের জন্য সপ্তাহে তিনদিন, দু ঘন্টা করে আমাকে ভাড়া করা হবে, আমিও ভাড়াটা বুঝে নেওয়ার হিসেব কষছি কিন্তু ভূলটা ভাঙল তখনই, যখন দেখলাম আমার পথপ্রদর্শকের সাইকেলটি নোংরা বস্তির দিকে বাঁক নিলো।
একটা বাড়ির পাশে এসে দাঁড়ালাম বরং বাড়ি না বলে, বলাভালো একটা ঝুপড়ি, মানে প্রথম যখন মানুষ ঘর বানাতে শিখেছিল সেইরকমই, এখানে শুধু তালপাতার ছাঊনির বদলে একটা জীর্ণ প্লাস্টিক ঝড়বৃষ্টির হাত থেকে এদের রক্ষা করছে, তবে কিভাবে রক্ষা করছে জানিনা? আমার মনেহয় ঝড়বৃষ্টি এই ঘর গুলোকে করুনা করে বলেই বোধহয় টিকে আছে,
একটাই ছোট্ট ছিন্নভিন্ন নোংরা রুম ওতেই দুই ছোট ছোট মেয়ে এক ছেলেকে নিয়ে পাঁচজন ভীড় বাসের মতো গা ঘেঁষাঘেঁষি করে টিকে আছে। এদের মানুষ বলা যায় কিনা এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, তবে নড়াচড়া করা দুপেয়ে ঊৎকট্ জৈব প্যাকেট বলা যেতেই পারে এনিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব থাকতেই পারেনা।
ছেঁড়া মাদুরটায় বসে মাছিদের এলোমেলো ঘুরে বেড়ানো দেখছি,হন্তদন্ত হয়ে এক মহিলা ঘরে এলেন, বুঝলাম ইনিই গৃহকর্ত্রী।তারপর আমাকে অনেক দিনের পরিচিত তাদের ঘরের ছেলে মনে করে মনখুলে কথা বললেন সাথে কোথা থেকে জানিনা একটা ডাটি ভাঙা কাপে কিছুটা চা নিয়ে এলেন।এদের কেন জানিনা বড়ো আপন মনে হচ্ছিল, কাল থেকে পড়াতে আসবো বলে এলাম।
পরেরদিন,স্টুডেন্ট আমার পাশে বসে একটু এটাওটা বলার পর বললো, "স্যার, পড়াশোনা করে কি হবে? শুধুশুধু বইখাতা নিয়ে বসে থাকা, এগুলো আমার ভালোলাগে না "। আমি খুব হেসেছিলাম বললাম, তোর স্যার হলাম কবে থেকে?আর আমিতো তোকে পড়াতেও আসিনি দুজন একটু গল্প করবো এইযা, আমাকে স্যার নয় দাদা বলেই ডাকবি বুঝলি?ঊচ্চবিত্ত পরিবারের মতো নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরাও স্বাধীনচেতা হয়, এও তার ব্যতিক্রম নয়, পড়াশোনা করেনা নইলে বেশ ভালো ছেলে, তারপর থেকেই আমাকে দাদা বলে ডাকে। ও বলা হয়নি, আমার স্টুডেন্টের নাম মনোজ ডাকনাম সোনু, আমি এই ডাকনামেই ডাকি, বাবা জুতো সারাই করেন মা বাড়ি বাড়ি ঝি এর কাজ করেন,মেয়ে দুটি টু আর ফাইভে পড়ে।
এই পরিবার গুলোর মানুষদের একটা বেশ স্বাধীন ভাবনা হলো,আজকের জন্য বেঁচে আছে পরেরদিন কি হবে তা নিয়ে অতোটা ভাবেনা অবশ্য ভাবনা থাকারও কথা নয় কারণ আজতো বেঁচে থাকি!!
সে যাইহোক,যেহেতু সোনুর পড়া করিয়ে দেওয়ার আর কেউ নেই তাই আমার ঊপরই দায়িত্ব ওকে বাবরের রাজধানী থেকে
ঘুরিয়ে এনে পরমাণুর নিঊক্লিয়াস হয়ে পাহাড় পর্বতের অবস্থান গননা করে রবি দাদুর পায়ে মাথা ঠোকাবার।
খুব সহজেই বুঝলাম মালভূমি-প্রোটন-মগধ এগুলো যেহেতু ওর কোনো কাজেই লাগেনা তাই এগুলো শিখতেও রাজি নয়।তারপর দুজনে নদীর ধারে বসে মাছ ধরেছি,কত গল্প করেছি, ওর স্বতস্ফুর্ত কথাগুলো বেশ লাগতো,সময় পেলেই মুক্ত পায়রার মতো দুজন ঊড়ে বেড়াতাম।
একদিন পরমাণুর নিঊক্লিয়াসের গঠন বোঝাচ্ছি, ও বলে ঊঠলো দাদা এইটা কিন্তু বেশ মজার না?!ছোট ছোট কনা ঘুরছে! আমরা সবাই আবার এই কনা গুলো দিয়ে তৈরি,দারুন!!,ওর বলা এই 'দারুন' শব্দটা মাথায় বারবার পাক খেতে খেতে মনটকে এক অদ্ভুত ভালোলাগায় ভরিয়ে রেখেছিলো।
সেদিন ওদের বাড়িতে গেছি, দেখি সোনুর মা (আমি দিদি বলি )এর জ্বর কদিন কাজে যেতে পারেনি আধশোয়া হয়ে বসে,ঘরের বাইরে এক ভদ্রমহিলা রাগী কণ্ঠে গজগজ করছে,বলতে শুনলাম, ওতোগুলো বাসন পড়ে আছে!,এতোগুলো কাপড়চোপড় তাহলে পরিস্কার কে করবে?তোর বড়ো মেয়েটাকে নয়তো একটু পাঠিয়ে দে,....।সেদিন সোনুকে আর পড়াই নি, দিদির কপাল ছুঁয়ে দেখলাম জ্বরটা বেশ ভালোই,সোনুকে ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে,ওর বড়ো মেয়ে অঞ্জলিকে মায়ের সেবাশুশ্রূষার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ঔষধগুলো কখন খেতে হবে দেখিয়ে বেরিয়ে আসছি সন্ধ্যা হয়ে গেছে,
নিয়ন বাল্বগুলো জ্বলে ঊঠেছে,চেনা পরিবেশটা আজ একটু বেশিই ভারী ভারী লাগছিল হঠাৎ দেখি রাস্তার দুধারের সুঊচ্চ ঝকঝকে বাড়িগুলো দৈত্যের মতো আমার দিকে চেয়ে বিকট কণ্ঠে হাসতে শুরু করেছে, বেশি পাত্তা না দিয়েই সাইকেলটা নিয়ে সোজা নদী পাড়ে চলে যাই স্রোতের গতিবেগ দেখার জন্য, বুঝলাম এই সবে স্রোতের গতি ঊল্টোদিকে বইতে শুরু করেছে আরও একটু সময় লাগবে স্রোতের তোড়ে সব গুড়িয়ে দেওয়ার।

Comments
Post a Comment